ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত চার দশক ধরে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিরোধীদের মধ্যে অনৈক্য এবং বিভাজনকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে বিরোধী পক্ষগুলো কখনো একজোট হতে না পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির টিকে থাকার মূল রহস্য হলো ভিন্নমতাবলম্বীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে রাখা এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস জিইয়ে রাখা।
ইরানের শাসনব্যবস্থায় খামেনি নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি একদিকে কট্টরপন্থীদের সমর্থন আদায় করেছেন, অন্যদিকে সংস্কারপন্থীদের মধ্যে সুকৌশলে ফাটল ধরিয়েছেন। যখনই কোনো বড় গণবিক্ষোভ বা অস্থিরতা দানা বেঁধেছে, তখনই তিনি অত্যন্ত কঠোর হাতে তা দমন করেছেন এবং প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদের বিদেশি চর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই বিভাজনের রাজনীতির কারণে ইরানের অভ্যন্তরে কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি।
খামেনির অধীনে থাকা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সরাসরি তাঁর নির্দেশে কাজ করে, যা তাঁর ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি। এছাড়া দেশটির বিচার বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থাও তাঁর অনুগত হওয়ায় বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা সহজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হলেও খামেনি তাঁর অনুগত অভিজাত শ্রেণির সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে নিজের গদি নিরাপদ রেখেছেন। গত কয়েক বছরে ইরানে বড় ধরণের গণআন্দোলন দেখা দিলেও একটি সংহত নেতৃত্বের অভাবে তা সফল হতে পারেনি।
শাসক হিসেবে খামেনি সবসময় নিজেকে দেশের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দাবি করেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর ভেতরকার আদর্শিক পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তুলেছেন। রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরেও বিভাজন সৃষ্টি করে তিনি তাঁর শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করেছেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ও উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চললেও, খামেনির তৈরি করা এই বিভাজনমূলক কাঠামো এখনো তাঁর ক্ষমতার সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।
